অনুসরণকারী

রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২০

18. ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস

 *ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস* 


 *====== প্রথম অধ্যায়,পর্ব -১৮ ======*


      *কল্পিত ইতিহাসের গোড়ার কথা* 


      এ স্থানে এসে কতিপয় ঐতিহাসিক মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিরোধানের পর ৫/৭ জন সাহাবী রাযি. ব্যতিরেকে অবশিষ্ট সকল সাহাবীর রাযি. মুরতাদ হয়ে যাওয়ার জঘন্য আক্বীদায় বিশ্বাসী শিয়াদের মিথ্যা ও জাল বর্ণনার উপর ভিত্তি করে সালিশী চুক্তি ও পরবর্তী ঘটনা এরূপে লিখেছেন যে নির্ধারিত সময়ে যখন সাহাবীদ্বয়ের রাযি. সালিশী বৈঠক আরম্ভ হয় তখন উভয় সালিশ হযরত আলী ও মুআবিয়া রাযি. উভয়কেই বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তে একমত হন। অতঃপর হযরত আমর ইবনুল ‘আস রাযি. চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে হযরত আবু মুসা আশআরী রাযি. কে প্রথমে তাঁর সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে ঘোষণার আহ্বান জানান। চুক্তি অনুযায়ী তিনি স্বাভাবিক ভাবে উভয়কেই খলীফার পদ হতে বরখাস্ত বলে ঘোষণা করেন। আর আমর ইবনুল ‘আস রাযি. বললেন- বরখাস্ত করছি কিন্তু মুআবিয়া রাযি. কে খলীফা হিসেবে বহাল রাখছি। মিথ্যা রচনাকারী শিয়ারা অতঃপর এ বিশিষ্ট দুই বুযুর্গ সাহাবীর রাযি. মধ্যে এমন অশ্লীল বাক্য বিনিময়ের কল্পিত বর্ণনাও দিয়েছে যা একদিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবী রাযি. চরিত্রের সাথে মোটেও সংগতিপূর্ণ নয় এবং অপর দিকে তা মেনে নেয়া শুধু ঐ সকল পাপিষ্ঠ দুরাচারীদের পক্ষেই সম্ভব যারা সাহাবীগণের রাযি. সমালোচনার ব্যাপারে মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট সতর্কবাণী উপেক্ষা করে তাদের দোষ চর্চা ও দোষ রচনায় লিপ্ত হয়।


      হযরত আমর ইবনুল আসে রাযি. বিশ্বাসঘাতকতা ও চাতুরীর ঘটনা যে শুধুই কল্পিত ও মিথ্যা তা সামান্য চিন্তা করলেই অনুমতি হয়। কেননা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে হযরত মুআবিয়া রাযি. এ পর্যন্ত কখনোই খিলাফতের দাবীই করেননি এবং তাকে খলীফা হিসেবে মানার জন্য তাঁর সমর্থকদের নিকট হতে তিনি কোনরূপ বাইআতও গ্রহণ করেননি। বরং তিনি শুধু হযরত উসমানের রাযি. নিকটাত্মীয় হওয়ার কারণে তাঁর হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবীদার ছিলেন। সে হিসেবে তিনি তার কিসাসের দাবীতে যুদ্ধ করে ‘আসছিলেন এবং বরাবর হযরত আলী রাযি. কেও এ কথাই বলে ‘আসছিলেন যে, আপনি হযরত উসমানের রাযি. হত্যাকারীদের বিচার করুন। আমি আপনাকে খলীফা মেনে নিয়ে আপনার হাতে বাই’আত হচ্ছি। তাছাড়া যখন সর্বপ্রথম এ কথার উপর সালিশী চুক্তি হয়েছিল যে, উভয় সালিশ ঐক্যমতের ভিত্তিতে কুরআন অনুযায়ী যে ফয়সালা করবেন- তা উভয় পক্ষ মেনে নিবেন, তখন হযরত আমর ইবনুল আসের রাযি. এ কথিত মিথ্যাচার ও বিশ্বাসঘাতকতার আশ্রয় নিয়ে তাঁর কি লাভ হবে? কেননা- তাদের বর্ণনা অনুযায়ী তো হযরত আলী রাযি. কে বরখাস্ত করে হযরত মুআবিয়া রাযি. কে খলীফা বানানোর তথাকথিত ঘোষণা তার একক সিদ্ধান্ত ছিল, উভয়ের ঐক্যমতের ভিত্তিতে ছিল না। কাজেই তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সুতরাং এ ধরনের অর্থহীন কাজ হযরত আমর ইবনুল ‘আস রাযি.- এর মত বিচক্ষণ সাহাবীর রাযি. পক্ষ থেকে কল্পনাও করা যায় না। তাই সেই কল্পকথা অপবাদমূলক ও মিথ্যাচার স্বার্থ প্রণোদিত।


      মূলতঃ সন্ধি চুক্তির পরবর্তী ঘটনার এরূপ বিবরণ সর্বপ্রথম ঐতিহাসিক ইমাম ইবনে জারীর ত্বাবারী তাঁর বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ ‘তারীখে ত্বাবারী’ তে উল্লেখ করেন। অতঃপর তাঁরই অনুসরণে অপরাপর ইতিহাসবিদগণ তাঁদের রচিত ইতিহাসগ্রন্থ সমূহে উক্ত কিতাবের রেফারেন্স দিয়ে কোনরূপ মন্তব্য ছাড়াই এ ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। এভাবে সংশ্লিষ্ট ঘটনার এ মিথ্যা ও জাল বিবরণটি জগদ্বিখ্যাত হয়ে পড়েছে।


      কিন্তু এ অন্যায়ের দোষ ইমাম ইবনে জারীর ত্বাবারীর উপর বর্তাবে না। কারণ, তাঁর গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি স্পষ্টতঃ বলে দিয়েছেন যে, সব কথার সত্যতা ও শুদ্ধতা যাচাই করে আমি এ গ্রন্থ রচনা করিনি, বরং যার নিকট যেরূপ বর্ণনা পেয়েছি- তাই উল্লেখ করেছি। তবে সুধীবৃন্দের জন্য প্রতিটি ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের সুবিধার্থে বর্ণনার তথ্যসূত্র তথা বর্ণনাকারীদের নাম- পরিচয় উল্লেখ করে দিয়েছি। যাদের বিস্তারিত জীবনালেখ্য ‘আসমাউর রিজাল বিষয়ক গ্রন্থসমূহে বর্ণিত আছে। পাঠকবৃন্দ ‘আসমাউর রিজাল গ্রন্থের মাধ্যমে বর্ণনাকারীর নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করে ঘটনার সত্যতার বা জাল হওয়া নির্ণয় করবেন।


      তারীখে ত্বাবারীতে এ ঘটনা বর্ণনাকারী হিসেবে কুখ্যাত আবু-মিখনাফের নাম পরিলক্ষিত হয়। ‘আসমাউর রিজালের কিতাবসমূহ অধ্যয়ন করলে তার নামে ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনাবলীর ব্যাপারে অসংখ্য মিথ্যা ও জাল বর্ণনা তৈরীর অভিযোগ পাওয়া যায়। সকল মুহাদ্দিসীনের বর্ণনা অনুযায়ী জানা যায় যে, সে ছিল কট্টর শিয়া। যারা আব্দুল্লাহ্‌ বিন সাবার সাবায়ী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত একটি জঘন্য বাতিল পন্থী দল ছিল। দীন ও ইসলাম সম্পর্কে যাদের জঘন্যতম বিশ্বাস সমূহের মধ্যে একটি বিশ্বাস এও ছিল যে, মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিরোধানের পর পাঁচ বা সাত জন সাহাবা রাযি. ব্যতীত সকল সাহাবীই রাযি. কাফির ও মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল। (নাউযুবিল্লাহ) এ কারণে তারা বুযুর্গ সাহাবীদের রাযি. প্রতি উম্মতের আস্থা বিনষ্টের ষড়যন্ত্র হিসেবে তাঁদের নামে নানা ধরনের মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে জাল ঘটনা তৈরী করে। হযরত আলী ও হযরত মুআবিয়ার রাযি. মধ্যে সিফফীনের যুদ্ধের পরে যে সন্ধি চুক্তি হয়, তার দুই সালিশদ্বয় হযরত আমর ইবনুল ‘আস ও হযরত আবু মুসা আশ’আরীর রাযি. ব্যাপারে মিথ্যাবাদী আবু মিখনাফের রচিত বর্ণনা সে সকল জাল বর্ণনারই অন্তর্ভুক্ত। (তথ্যসূত্র: আল্‌-‘আওয়াসিম-মিনাল ক্বাওয়াসিম, পৃঃ ১৭৪-১৭৯’)


      এদিকে হযরত আলী ও হযরত মুআবিয়ার রাযি. সালিশী চুক্তির পর নতুন করে আবার সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা দেখা দেয়ায় সাবায়ীরা নিজেদের প্রমাদ গোনে। তাই তারা এ সালিশী চুক্তির বিরোধিতা করে এ বিপক্ষে অপপ্রচার চালিয়ে জনমনে সে সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে সচেষ্ট হয়। অথচ সিফফীনের যুদ্ধে হযরত আলীর রাযি. নিশ্চিত বিজয়কে বানচাল করার জন্য তারাই হযরত আলী রাযি. কে চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করেছিল।


      জঙ্গে সিফফীনের পর হযরত আলীর রাযি. পক্ষ থেকে সালিশী চুক্তি সম্পাদনের ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে একদল সাবায়ী এ বলে বিরোধিতা আরম্ভ করে যে, আল্লাহ্‌র ফয়সালা ব্যতীত কোন মানুষ তথা সালিশের ফয়সালা মানা ইসলাম বিরোধী ও কুফরী কাজ। এই বলে তারা হযরত আলীর রাযি. দল হতে ‘খুরুজ’ (বিদ্রোহ) করে বের হয়ে যায়। তখন হতে এ দলটি ‘খারেজী’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। হযরত আলী রাযি. তাদের বুঝালেন- আমরা তো সালিশদ্বয় হতে এ অঙ্গীকার নিয়েছি যে, তারা আল্লাহর বিধান তথা কুরআন অনুযায়ীই ফয়সালা করবেন। তারা যদি আল্লাহর বিধান মে ফয়সালা করেন, তবেই আমরা তা মেনে নিব। নতুবা তা আমরা মানব না। তখন খারেজী দল পাল্টা প্রশ্ন করল- তাহলে আপনি কি অন্যায় ভাবে হত্যার ব্যাপারে কোন মানুষের ফয়সালা মানাকে বৈধ মনে করেন? অথচ কুরআনে তার শাস্তি নির্ধারিত আছে। হযরত আলী রাযি. উত্তর দিলেন- আমি তো কোন মানুষের ফয়সালা কখনো মেনে নেয়নি; বরং আমি কুরআনের ফয়সালাই গ্রহণ করেছি। তবে এ ফয়সালার ঘোষণা দিবেন সালিশদ্বয়। কুরআন শরীফ তো একটি কিতাব, তাতো নিজে ফয়সালা ঘোষণা করতে পারে না।


      হযরত আলী রাযি. এত সব যুক্তি-তর্ক দিয়ে বুঝানোর পর বাহ্যিকভাবে মেনে নিলেও বস্তুতঃ খারেজীরা তাদের মতের ব্যাপারে অটল থাকে।


   _*🗒️নিজে পড়বেন এবং শেয়ার করে অন্যদেরকেও জানার সুযোগ করে দিবেন।*_

17. ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস

 *ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস* 


 *====== প্রথম অধ্যায়,পর্ব -১৭ ======*


          *জঙ্গে সিফফীনের ইতিহাস*


 *জঙ্গে সিফফীন মুসলিম বিশ্বকে স্থায়ীভাবে বিভক্ত করে রাখার আত্মঘাতী ষড়যন্ত্রঃ* 


 *আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেনঃ* 


 *لَوْ خَرَجُوْا فِیْكُمْ مَّا زَادُوْكُمْ اِلَّا خَبَالًا وَّلَا۠ اَوْضَعُوْا خِلٰلَكُمْ یَبْغُوْنَكُمُ الْفِتْنَۃَ ۚ وَفِیْكُمْ سَمّٰعُوْنَ لَهُمْ ؕ وَاللهُ عَلِیْمٌۢ بِالظّٰلِمِیْنَ ﴿۴۷﴾ لَقَدِ ابْتَغَوُا الْفِتْنَۃَ مِنْ قَبْلُ وَقَلَّبُوْا لَکَ الْاُمُوْرَ حَتّٰی جَآءَ الْحَقُّ وَظَهَرَ اَمْرُ اللهِ وَهُمْ کٰرِهُوْنَ* 


   *অর্থঃ* যদি মুনাফিকরা তোমাদের সাথে (তাবুকের) জিহাদে বের হত তবে তোমাদের অনিষ্ট ছাড়া আর কিছু বৃদ্ধি করত না। আর অশ্ব ছুটাত তোমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি উদ্দেশ্যে। আর তোমাদের মাঝে রয়েছে তাদের গুপ্তচর। বস্তুতঃ আল্লাহ জালিমদের ভালভাবেই জানেন। তারা পূর্ব থেকেই বিভেদ সৃষ্টির জন্য সুযোগ সন্ধানে ছিল এবং আপনার কার্যসমূহ উলট পালট করে দিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সত্য প্রতিশ্রুতি এসে গেল এবং জয়ী হল আল্লাহর হুকুম যে অবস্থায় তারা মন্দবোধ করছিল। (সূরাহ তাওবাহ ৪৭-৪৮)


      মুনাফিকদের ব্যাপারে কুরআনে কারীমের উপরোক্ত ভবিষ্যদ্বানী সূচনালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত অব্যাহতভাবে জারী আছে দুনিয়ার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জারী থাকবে। সেজন্য মুসলমানদের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং নিম্মের ঘটনা প্রবাহ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।


      হযরত আলী রাযি. বসরা হতে কুফায় প্রত্যাবর্তন করেন। কুফায় কিছু দিন অবস্থান করার পর আবার তিনি মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের লক্ষ্যে হযরত মুআবিয়া রাযি. এর উদ্দেশ্যে সিরিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এখানেও সাবায়ীরা হযরত আলি ও হযরত মুআবিয়া রাযি. এর মাঝে যাতে কিছুতেই কোনরূপ ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে সে জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালায় ও তৎপর থাকে। এই দুস্কৃতিকারীরা হযরত আলী রাযি. কে চতুর্দিক হতে এমনভাবে পরিবেষ্টিত করে রেখেছিল এবং তাঁর দলের সাথে এরূপ একত্রিত হয়ে গিয়েছিল যে হযরত আলী রাযি. কিছুতেই তাঁদের পরিবেষ্টন হতে বেরিয়ে ‘আসতে পারছিলেন না এবং তাদের বিচারও করতে পারছিলেন না। হযরত উসমানের রাযি. বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও তার হত্যাকাণ্ডে সফল হওয়ার পর সংখ্যায় নগণ্য হলেও রাজনৈতিকভাবে সাবায়ীরা তখন একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত দল হিসেবে সকলের মধ্যে প্রভাব ও ভীতি বিস্তারে সক্ষম হয়েছিল। সে সুবাদে তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরকারী পদ দখল করা ছাড়াও সকল ক্ষেত্রে প্রভাব খাটাতে সামর্থ্য হয়েছিল। এ সকল কারণে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ খিলাফতের ভিত্তি মজবুত হওয়ার ব্যতিরেকে হযরত আলীর রাযি. পক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কোন রূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করা কিছুতেই সম্ভব ছিল না।


      একদিকে যেমন হযরত আলী রাযি. সর্বদাই হযরত উসমানের রাযি. হত্যাকাণ্ডের বদলা নেয়ার পূর্বে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ খিলাফতকে মজবুত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন। অপর দিকে হযরত আয়িশা রাযি. ত্বালহা, যুবাইর, মুআবিয়া রাযি. হযরত আলীর রাযি. চতুর্দিকে সাবায়ীদের দেখে তাঁকে খলীফা মানতে অস্বীকার করেন যাবত না তিনি সাবায়ীদেরকে স্বীয় সঙ্গ হতে বহিস্কার করে তাদের বিচার না করেন। আর তখনকার এরূপ জটিল পরিস্থিতিতে এ ধরনের বিপরীত মত পোষণ করা কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না।


      লক্ষণীয় যে, আজ আমরা এর চেয়ে অনেক সাধারণ বিষয় নিয়েও বহুধাবিভক্ত হয়ে যাই। আর যদি এমন কোন কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি হত তাহলে আমাদের মাঝে যে কত মত ও পথের সৃষ্টি হতো তা একমাত্র আল্লাহপাকই জানেন। যা হোক, তখন এরূপ জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টিতে সাবায়ী চক্র সফল হয়ে গেলে সাহাবায়ে কিরামের রাযি. মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয় যা ছিল খুবই স্বাভাবিক।


      তবে যে কোন মতানৈক্যের ক্ষেত্রে সকল মতই পরিপূর্ণ সঠিক হতে পারে না। একটি সঠিক হলে অপরটি ভুল হবে এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং আলোচ্য ঘটনার ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকাইদ হচ্ছে যে হযরত আলীর রাযি. মতই সঠিক ছিল।


      আর ভিন্নমত পোষণকারী হযরত আয়িশা, ত্বালহা, যুবাইর ও মুআবিয়া রাযি. এর মত নির্ভুল ছিল না। কিন্তু তাদের সেই ভুল ইচ্ছাকৃত ও গোঁড়ামীপূর্ণ ছিল না বরং তা ছিল দীন ইসলামের স্বার্থে ও মহান আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তা ছিল তাদের উদ্ভাবিত পন্থায় অনিচ্ছাকৃত ইজতিহাদী ভুল।


      আর শরী‘আতের বিধানমতে যে সকল ক্ষেত্রে মতানৈক্যের অবকাশ আছে সে সকল ক্ষেত্রে ‘মুজতাহিদগন’ তথা শরীয়ত স্বীকৃত প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিগণ যদি সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছার জন্য সম্ভাব্য চিন্তা-ফিকির করার পরও কোনরূপ ভুল করে ফেলেন তবুও তারা গুনাহগার তো হনই না বরং সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত মুজতাহিদ এর ন্যায় তারাও সাওয়াবের অংশীদার হন। তবে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত মুজতাহিদগণ দ্বিগুণ সাওয়াব পান আর সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পর ভুল সিদ্ধান্তের উপনীত মুজতাহিদগণ পান তার অর্ধেক সাওয়াব। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এক চির অমর বানীতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন: যখন মুজতাহিদ বিচারক ইজতিহাদের মাধ্যমে সঠিক বিচার করে তখন সেই দুই সাওয়াবের অধিকারী হয়। আর যখন ইজতিহাদ করে অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল সিদ্ধান্ত দেয় তখন সে এক সাওয়াব পায়।


      হযরত আলী রাযি. তাঁর মত অনুযায়ী সাবায়ীদের বিচারের পূর্বে ঐক্যবদ্ধ খিলাফত প্রতিষ্ঠার সর্বশেষ প্রচেষ্টা হিসেবে হযরত মুআবিয়া রাযি. ও তার অনুগত লোকদের ঐক্যবদ্ধ মুসলিম শক্তির পতাকাতলে আনার জন্য সিরিয়ার উদ্দেশ্যে বের হলে জঙ্গে জামালের ন্যায় এখানেও উভয় বাহিনী পরস্পর মুখোমুখি হয়েও যুদ্ধে লিপ্ত না হয়ে প্রথমে তারা আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পান। যদিও হযরত আলী ও হযরত মুআবিয়া রাযি. বা তাঁদের দলের কোন মুসলমানই পরস্পরের কোন্দল ও যুদ্ধ কামনা করতেন না। কিন্তু হযরত আলীর রাযি. পক্ষে আলোচনাকারী প্রতিনিধি দলে সাবায়ীরা তাদের প্রভাব ও শক্তি বলে (যা পরিস্থিতির নাজুকতার কারণে হযরত আলীর রাযি. নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল) অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে অনুপ্রবেশ করে আলোচনায় আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ শুরুতেই ভণ্ডুল করে দেয়।


      তারা হযরত মুআবিয়ার রাযি. সঙ্গে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ করা ছাড়াও তাকে যা ইচ্ছে তাই বলে গাল-মন্দ করতে থাকে এবং বার বার তাকে যুদ্ধের হুমকি দিতে থাকে। হযরত আলী রাযি. শান্তি চুক্তি কামিয়াব করার জন্য বার বার প্রতিনিধি দল পাঠানো সত্ত্বেও ঐ একই কারণে সকল প্রচেষ্টা নস্যাৎ হয়ে যায়। হযরত আলীর রাযি. পক্ষের লোক হয়ে সাবায়ীদের এহেন আচরণ ও স্পর্ধা অবলোকনে হযরত মুআবিয়া রাযি. সাবায়ীদের বহিস্কার ও বিচারের পূর্বে হযরত আলী রাযি. কে খলীফা না মানার দাবী আরো যুক্তিযুক্ত ও সুসংহত হয়। যার দরুন শান্তি আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি, পরিণতিতে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। যুদ্ধ বেধে গেলেও প্রথমে কোন পক্ষেরই তেমন উদ্যম ও স্পৃহা পরিলক্ষিত হচ্ছিল না। কারণ কোন পক্ষই মুসলমানদের পারস্পরিক যুদ্ধে আগ্রহী ছিল না বরং তারা যথাসাধ্য এ আত্মঘাতী যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।


      কিন্তু এতে কোন ফল হয়নি বরং ধীরে ধীরে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তে থাকে এবং হযরত আলী রাযি. জয় লাভের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। যখন হযরত আলীর রাযি. চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত হয়ে এলো তখনই হঠাৎ হযরত মুআবিয়ার সিরিয় বাহিনীর লোকেরা তীরের মাথায় কুরআন শরীফ ঝুলিয়ে যুদ্ধ বন্ধ ও কুরআনের ফায়সালা মেনে নেয়ার জন্য উভয় পক্ষকে আহ্বান জানায়। হযরত আলী রাযি. এটাকে সিরিয়দের পরাজয় এড়ানোর কৌশল অভিহিত করে তার বাহিনীকে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু সাবায়ী দল হযরত আলীর রাযি. চূড়ান্ত বিজয়ে নিজেদের মৃত্যু ঘণ্টা শুনতে পায়। কেননা এ যুদ্ধে জয় লাভ করতে পারলে হযরত আলীর রাযি. জন্য ঐক্যবদ্ধ খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আর কোন বাধাই থাকবে না। অতঃপর তিনি সাবায়ীদের সমূলে ধ্বংস করবেন। তাই তারা হযরত আলী রাযি. কে বিজয়ের দিকে অগ্রসর হতে দেখেই কোন ছুতা ধরে যে কোনভাবে চূড়ান্ত বিজয়ের পূর্বেই যুদ্ধ থামিয়ে দিয়ে মুসলমান ও মুসলিম বিশ্বকে স্থায়ীভাবে দুই শিবিরে বিভক্ত করে রাখতে এবং ঐক্যবদ্ধ খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হতে দেয়ার জন্য ওঁত পেতে ছিল।


      এ লক্ষ্যে সিরিয়দের কুরআন উঁচিয়ে যুদ্ধ বন্ধের আবেদন শোনা মাত্র হযরত আলীর রাযি. নির্দেশ উপেক্ষা করে তাঁর সৈন্যবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে রাখা সাবায়ী নেতারা সুযোগ বুঝে এই বলে বেকে বসল এটা কিভাবে হতে পারে যে আমাদের ‘আসমানী গ্রন্থ আল-কুরআনের প্রতি আহ্বান করা হবে আর আমরা তা অস্বীকার করব? এতদসত্ত্বেও হযরত আলী রাযি. যুদ্ধ অব্যাহত রাখার তাগিদ করলেন কমান্ডাররা তাঁকে সরাসরি এই বলে হুমকি দেয় আপনি যুদ্ধ বন্ধ করুন অন্যথায় আমরা আপনার সঙ্গেও তেমনি আচরণ করবো যেমনটি উসমানের রাযি. সাথে করেছি।


      সাবায়ীরা কুরআনের দোহাই দিয়ে হযরত আলীর রাযি. সৈন্যবাহিনীর একটি বিরাট অংশকে বিভ্রান্ত করে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। তখন নিজের দলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়ার আশংকায় হযরত আলী রা. অপারগ হয়ে তার সিপাহসালার ‘আশতার’ কে যুদ্ধ বন্ধ করে ফিরে আসার নির্দেশ দেন। আশতার যুদ্ধ বন্ধ ঘোষণা করে ফিরে আসেন। ইতিহাসে এ যুদ্ধ জঙ্গে সিফফীন নামে প্রসিদ্ধ।


      যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পর হযরত আলী রাযি. হযরত মুআবিয়ার রাযি. নিকট দূত পাঠিয়ে কুরআন শরীফের ফয়সালা মেনে নেয়ার ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। হযরত মুআবিয়া রাযি. উত্তর পাঠালেন উভয় পক্ষ একজন করে সালিশ (তৃতীয় পক্ষ) নিয়োগ করবেন এবং তাদের নিকট হতে কুরআনের বিরুদ্ধে কোন ফয়সালা না করার অঙ্গীকার নিবেন। অতঃপর কুরআনের নির্দেশ মুতাবিক তারা দু’জনে আমাদের বিরোধ নিষ্পত্তির যে উপায় নির্ধারণ করবেন আমরা তা মেনে নিব। হযরত আলীর রাযি. বাহিনীর লোকেরা এটাকে সর্বান্তকরণে গ্রহণ করলেন।


      অতঃপর হযরত আলীর রাযি. পক্ষ হতে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবু মূসা আশআরী রাযি. কে এবং হযরত মুআবিয়ার রাযি. পক্ষ হতে অপর প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আমার ইবনুল ‘আস রাযি. কে সালিশ নির্ধারণ করা হয়। উভয় পক্ষই এ দুই সালিশ কুরআন অনুযায়ী যে ফয়সালা করবেন তা মেনে সেটার বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগিতার অঙ্গীকার করেন। এ লক্ষ্যে তাদেরকে ছয় মাসের সময় দেয়া হয় এবং উভয় সালিশের জান ও মালের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।


      সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও প্রমাণভিত্তিক বর্ণনা অনুযায়ী পরবর্তী ঘটনার বিবরণ এরূপ জানা যায় যে চুক্তি সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর সালিশী সাহাবীদ্বয় রাযি. সদলবলে ‘দাউমাতুল জান্দাল’ নামক স্থানে একত্রিত হলেন। তাছাড়া নিরপেক্ষ আরো কয়েকজন বিশিষ্ট বুযুর্গ সাহাবীও রাযি. তথায় উপস্থিত হন।


      দীর্ঘ আলোচনা পর্যালোচনার পর উভয় সালিশ হযরত আলীর রাযি. খিলাফত বিতর্কিত হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁকে এ দায়িত্ব হতে অব্যাহতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং এ বিষয়টি লিখিত হয়ে যায় এবং তাতে উভয়ে দস্তখত করেন। আর হযরত মুআবিয়া রাযি. যেহেতু পূর্ব হতে খলীফাই ছিলেন না এবং তিনি নিজেও এখনো পর্যন্ত খিলাফতের দাবী করেন নি তাই তাঁকে খিলাফতের মসনদে বহাল রাখা বা অব্যাহতি দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না।


      অতঃপর উক্ত মজলিসে সমগ্র উম্মতের ঐক্যমতের ভিত্তিতে পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের প্রসঙ্গে উত্থাপিত হয়। হযরত আবু মুসা আশআরী রাযি. হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমরের রাযি. নাম প্রস্তাব করেন। তিনি মুসলমানদের এই পারস্পরিক হানাহানিতে বরাবরই নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে ‘আসছিলেন। অপর পক্ষে হযরত আমার ইবনুল ‘আস রাযি. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণে অনীহার কথা উল্লেখপূর্বক তিনি বিশিষ্ট আনসারী রাযি. সাহাবী হযরত সা‘আদ বিন আবী ওয়াক্কাসের রাযি. নাম প্রস্তাব করেন। কিন্তু হযরত আবু মুসা আশআরী রাযি. তাতে দ্বিমত পোষণ করেন। অতঃপর হযরত আমর ইবনুল ‘আস রাযি. আরো একাধিক বুযুর্গ সাহাবী রাযি. নাম প্রস্তাব করেন। কিন্তু কারো ব্যাপারেই তাঁরা উভয়ে একমত হতে পারেননি।


      অবশেষে সালিশ সাহাবীদ্বয় রাযি. নতুন খলীফা মনোনয়নের বিষয়টি তখন পর্যন্ত যে সকল প্রবীণ সাহাবী রাযি. জীবিত ছিলেন তাঁদের দায়িত্বে ছেড়ে দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন শেষ করেন। অবশ্য নতুন খলীফা নিযুক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত হযরত আলী এবং মুআবিয়া রাযি. কে আঞ্চলিক হামি বা প্রশাসক হিসেবে এদের অধীনস্থ এলাকার মধ্যে একথার উপর বহাল রাখা হয় যে, তাঁরা দুজন এ অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে নিজ নিজ এলাকার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবেন। এ কথার উপর হযরত আবু মুসা আশআরী ও আমর ইবনুল আসের রাযি. সালিশী বৈঠক শেষ হয়। (আল-আওয়াসিম-মিনাল ক্বাওয়াসিম-১৮৪)


      এখানে উল্লেখ্য যে, তাহ্‌কীম তথা সালিশ গঠন ও সালিশ কর্তৃক ফয়সালা ঘোষণার পর হযরত আলী রাযি. ও মুআবিয়ার রাযি. দলের মধ্যে আর কোন যুদ্ধ-বিগ্রহ সংঘটিত হয়নি। বরং উভয় পক্ষই যুদ্ধ বিরতি মেনে নেয় এবং তার উপর বহাল থাকে।


   _*📋নিজে পড়বেন এবং শেয়ার করে অন্যদেরকেও জানার সুযোগ করে দিবেন।*_

16. ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস

 *ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস* 


 *====== প্রথম অধ্যায়,পর্ব -১৬ ======*


             *জঙ্গে জামালের ইতিহাস* 


 *জঙ্গে জামাল মুসলিম ইতিহাসের মর্মান্তিক ট্রাজেডিঃ* 


      বৈঠক শেষ করে উভয় পক্ষ স্ব স্ব শিবিরে ফিরে আসেন, উভয় পক্ষের সন্ধি প্রিয় লোকেরা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ পেলেন এবং উভয় পক্ষের সৈন্যরাই রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল, এদিকে রাতের আধার কাটার পূর্বেই মরণ কামড় হানার লক্ষ্যে ওঁত পেতে থাকা সাবায়ী গোষ্ঠীর লোকেরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে একদল হযরত আয়িশা হযরত আলীর রাযি. ঘুমন্ত বাহিনীর উপর আক্রমণ করল এবং উভয় দলের মধ্যেই অপর পক্ষের বিশ্বাসঘাতকতা ও আক্রমণের সংবাদ ছড়িয়ে দিল। ফলে তাদের মাঝে বেধে গেল তুমুল যুদ্ধ। উভয় পক্ষের যুদ্ধের এই ডামাডোল চলাকালীন সময়ে সাবায়ীরা উভয় দলের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যা করতে ওঁত পেতে থাকে। যুদ্ধের প্রারম্ভে কাব বিন ছাওরিয়া হযরত আয়িশার রাযি. পক্ষ হতে শান্তিবানী ও যুদ্ধ বিরতির ঘোষণা নিয়ে দাঁড়ালে সাবায়ীরা তাকে তীর নিক্ষেপে হত্যা করে এবং একই সঙ্গে তারা হযরত আয়িশার রাযি. হাওদা (উটের পিঠের উপর বসার স্থান যাতে তিনি অবস্থান করছিলেন) কে তীর নিক্ষেপের নিশানা বানায়। এমতাবস্থায় স্বয়ং মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবারকে আশংকা জনক অবস্থায় দেখে বসরাবাসীগণ তাঁর হাওদা ঘিরে রাখেন। হযরত আয়িশা রাযি. কে আঘাত করতে ব্যর্থ হয়ে সাবায়ী গোষ্ঠী তাঁর উটের চালককে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানায় এতে একের পর এক সত্তর জন প্রাণ উৎসর্গ করেন।


      রাতের অন্ধকারে উভয় দলের উপর সাবায়ীদের চরম রক্তক্ষয়ী ষড়যন্ত্রমূলক আক্রমণের মাধ্যমে পারস্পরিক যে ভুল বুঝাবুঝি ও অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছিল তার রেশ কেটে অবশেষে যখন যুদ্ধ বন্ধ হলো তখন দেখা গেল যে, ইতিমধ্যে সাবায়ীদের চক্রান্তে মুসলমানদের পারস্পরিক ভুল বুঝাবুঝিতে তাদের হাতে দশ হাজার মুসলমান শহীদ হয়ে গেছেন। যাদের মধ্যে আশারা মুবাশশারার অন্যতম দুই সাহাবী হযরত ত্বালহা ও যুবাইর রাযি. এবং হযরত ত্বালহার রাযি. দুই ছেলেও ছিলেন।


      যুদ্ধ শেষে হযরত আলী রাযি. ময়দানের সকল প্রান্তে ঘুরে ঘুরে দেখলেন এবং নেতৃস্থানীয় সাহাবীদের রাযি. এই অনর্থক গৃহযুদ্ধের শিকার হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থাকতে দেখে তিনি অত্যন্ত আবেগাপ্লূত হয়ে উঠেন এবং আফসোস করতে থাকেন। হযরত ত্বালহার রাযি. লাশ দেখে আফসোস করে বললেন- কুরাইশ গোত্রীয় কোন ব্যক্তিকে আমি লুটে পড়ে থাকতে দেখা সহ্য করতে পারি না। অতঃপর তিনি তার অনেক গুন কীর্তন করার পর উভয় পক্ষের শহীদগণের জানাযা পড়ান ও তাদের কাফন দাফনের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। এভাবেই সাবায়ীদের ষড়যন্ত্র সফলতা লাভ করে এবং এ সময়ই সর্বপ্রথম এক মুসলমানের হাত অপর মুসলমান ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হয়। ইতিহাসে এ যুদ্ধ জঙ্গে জামাল নামে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে।



   _*📋নিজে পড়বেন এবং শেয়ার করে অন্যদেরকেও জানার সুযোগ করে দিবেন।*_

শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২০

15. ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস

 *ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস* 


 *====== প্রথম অধ্যায়,পর্ব -১৫ ======*


 *সাবায়ীদের বিরুদ্ধে হযরত আলী রাযি. এর দ্ব্যর্থহীন ভাষণ ও এর প্রতিক্রিয়াঃ* 


      হযরত আলী রাযি. শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য বসরা গমনের প্রস্তুতি নিলেন। রওয়ানা হওয়ার পূর্বে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে তিনি একটি ভাষণ দিলেন। ভাষণে তিনি জাহিলিয়াতের অন্ধকার ও ইসলামের আলোর কথা উল্লেখ করেন। অতঃপর মুসলমনাদেরকে পারস্পরিক ঐক্য, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের যে মহান নিয়ামত দান করা হয়েছিল, তা উল্লেখপূর্বক বর্তমান অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলার উপর দুঃখ প্রকাশ করেন এবং এর জন্য ইসলাম বিদ্বেষীদের ষড়যন্ত্রকেই দায়ী করে বলেন- “যারা মুসলমানদের উন্নতি ও প্রতিপত্তি সহ্য করতে পারে না এবং মুসলমানদের বিশ্বব্যাপী রাজত্ব বিস্তারে ঈর্ষান্বিত হয়ে তাদের অধঃপতন কামনা করে বর্তমানের এ সৃষ্ট পরিস্থিতি তাদেরই ষড়যন্ত্রের পরিণতি।”


      অতঃপর তিনি বললেন- আগামীকাল আমরা বসরায় যাব। কিন্তু আমাদের এই সফর যুদ্ধের উদ্দেশ্যে নয় বরং শান্তি ও একতার জন্য। অতএব যারা হযরত উসমানের রাযি. হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিল তাদের কেউ যেন আমাদের সঙ্গে না যায়।


      হযরত আলীর রাযি. স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন এ ভাষণ শ্রবণ করতঃ সাবায়ীদের পয়ের নীচ হতে মাটি সরে গেল। তাই যে কোন মূল্যে এই ঐক্য প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করার লক্ষ্যে মরণ কামড় হানার পায়তারায় আব্দুল্লাহ বিন সাবা তার ঘনিষ্ঠ সাঙ্গ পাঙ্গদের নিয়ে এক গোপন বৈঠকে বসল। বৈঠকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতঃ তারা মতামত ব্যক্ত করল যে যদি আলী রাযি. ও ত্বালহা-যুবাইরের রাযি. মাঝে ঐক্য সম্পাদিত হয়ে যায় তাহলে তা আমাদের রক্তের উপর দিয়ে সম্পাদিত হবে যা আমাদের এতদিনের সকল প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দিবে। অতএব যে কোন মূল্যে এ সন্ধি প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিতে হবে।


      পরের দিন সকালে হযরত আলী রাযি. স্বীয় বাহিনীসহ বসরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলেন। অপরপক্ষে হযরত ত্বালহা-যুবাইর রাযি. ও তাদের বাহিনী নিয়ে বসর হতে বেরিয়ে ‘আসলেন। উভয় দর তিন দিন পর্যন্ত মুখোমুখি অবস্থান করল। উভয়পক্ষের মাঝে আলোচনা চলতে থাকল। অবশেষে হযরত আলী রাযি. হযরত ত্বালহা ও যুবাইর রাযি. নিকট প্রস্তাব পাঠালেন যে, ক্বা‘ক্বা‘র সঙ্গে এর পূর্বে যে কথা হয়েছিল তাতে যদি আপনারা একমত থাকেন তাহলে আর সময় ক্ষেপণ না করে চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে যাওয়া উচিৎ। তাঁরা উত্তর দিলেন আমরা নিঃসন্দেহে সে কথার উপর অটল আছি। অতঃপর এ পক্ষ থেকে এই দু’জন ও অপরপক্ষ হতে হযরত আলী রাযি. নিজ ঘোড়ায় আরোহণ করে বের হলেন এবং অপরের সঙ্গে লেগে গেল। অতঃপর দীর্ঘক্ষণ ধরে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এই তিন নেতার সরাসরি বৈঠক ও আন্তরিক আলোচনা হল। আলোচনায় উভয়পক্ষেই অতীতের বিভিন্ন স্মৃতি চারণ করলেন। এ বৈঠকের পর সন্ধিচুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ব্যাপারে আর কোন সন্দেহ ও আশংকা রইল না।


   _*📋নিজে পড়বেন এবং শেয়ার করে অন্যদেরকেও জানার সুযোগ করে দিবেন।*_

14. ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস

 *ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস* 


 *====== প্রথম অধ্যায়,পর্ব -১৪ ======*


*সফলতার পথে সাবায়ী ষড়যন্ত্র* 


      এদিকে হযরত আলী রাযি. খলীফা মনোনীত হওয়ার পর সাবায়ী দল কর্তৃক সৃষ্ট গোলযোগপূর্ণ ও বিশৃঙ্খল মুহূর্তে তার চতুর্দিকে সাবায়ীদের শক্ত আধিপত্য ও ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থান এবং এরই সঙ্গে হযরত আলীর রাযি. সমর্থন ও ক্ষমতার প্রভাবে সাবায়ী চক্রের দৃঢ় অবস্থান ও প্রভাব কিছুতেই খতম করতে না পারার দরুন হযরত আলী রাযি. বিরোধী শিবিরে অবস্থান গ্রহণকারী সাহাবীগণের রাযি. সংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়েই চলছিল।


      আর এর মাধ্যমে মুসলমানদের ঐক্যকে চূর্ণ করে তাদেরকে দুই শিবিরে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র সফলতার দিকে এগুচ্ছিল। এক দিকে হযরত আয়িশা, তালহা, যুবাইর, মুআবিয়া প্রমুখ সাহাবা রাযি. ও তাদের অনুসারীগণ হযরত আলীর রাযি. প্রতি তাদের দাবী ছিল আপনি খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর আপনার প্রথম কর্তব্য হচ্ছে হযরত উসমানের রাযি. হত্যার বদলা নেয়া। অপর দিকে হযরত আলী রাযি. ও তাঁর সমর্থকগণের বক্তব্য ছিল যেহেতু আমরা পরিস্থিতির শিকার হয়ে সাবায়ীদের দৃঢ় অবস্থান ও প্রভাব সীমিত শক্তি দ্বারা খতম করতে পারছি না তাই আপনারাও এগিয়ে আসুন এবং নির্বাচিত খলীফার হাতে বাই’আত করে তার হাত কে শক্তিশালী করুন এবং খিলাফতের ভিত্তি মজবুত করুন। অতঃপর তিনি অবশ্যই তাদের (সাবায়ী) বিচার করবেন। হযরত উসমানের রাযি. রক্ত তিনি কিছুতেই বৃথা যেতে দিতে পারেন না।


      হযরত আলী রাযি. এ বক্তব্য জনসাধারণের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। অনেকে হযরত আলীর রাযি. সাথে এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করলেও অন্যরা এটাকে হযরত উসমানের রাযি. হত্যার বদলা নেয়া হতে তাঁর পাশ কাটানোর চেষ্টা বলে অভিহিত করলো। আর সাবায়ীরা হযরত আলীর রাযি. উল্লেখিত বক্তব্য শ্রবণে চিন্তা করলো যে যদি তিনি প্রতিকুল পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে সামান্য নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ পান, তাহলে আমাদের আর রক্ষা নেই। অতএব আমদের এরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টির বিরুদ্ধে সর্বদা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।


      এদিকে হযরত মুআবিয়া রাযি. তাঁর শাসিত ‘শাম প্রদেশে’ হযরত উসমানের রাযি. হত্যাকারীদের বদলা নেয়ার পক্ষে জনমত গঠনে ব্যস্ত থাকায় হযরত আলী রাযি. তাঁর প্রতি বাইআতের আহ্বান জানিয়ে পত্র প্রেরণ করেন। হযরত মুআবিয়ার রাযি. পক্ষ হতে সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়ার হযরত আলী রাযি. বুঝে নিলেন যে, ব্যাপারটি এত সহজে সমাধান হবার নয়। অতএব, তিনি হযরত মুআবিয়ার রাযি. বিরুদ্ধে শাম (সিরিয়া) অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।


      অপরদিকে হযরত আয়িশা রাযি. মক্কা হতে হজ্জ পালন করে মদীনা ফিরার সময় পথিমধ্যে সাবায়ী দল কর্তৃক হযরত উসমানের রাযি. শাহাদাত ও মদীনা দখলের সংবাদ শ্রবণ পূর্বক মক্কা প্রত্যাবর্তন করে সাবায়ীদের বিচার ও মদীনাকে তাদের দখলমুক্ত করার পক্ষ জনমত গঠন করতে থাকেন। হযরত ত্বালহা ও যুবাইর রাযি. সহ আরো অনেকেই মদীনা থেকে মক্কায় এসে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। তাঁদের পরামর্শে হযরত আয়িশা রাযি. হযরত আলীর রাযি. উপর চাপ প্রয়োগের লক্ষ্যে, অর্থ ও সামরিক শক্তি অর্জনের জন্য সমমনা লোকদের সাথে বসরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।


      হযরত আয়িশা রাযি. কর্তৃক বসরা অভিযানের সংবাদ শুনে তথায় হযরত আলী রাযি. কর্তৃক নিযুক্ত গভর্নর উসমান বিন হানিফ এ অভিযান প্রতিহত করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। অতঃপর হযরত আয়িশা রাযি. সদলবলে বসরা আগমনের পর উভয় পক্ষ যুদ্ধ এড়িয়ে সন্ধির পথ বের করতে মনোনিবেশ করেন। কিন্তু বসরায় নিযুক্ত আব্দুল্লাহ বিন সাবার এজেন্ট হাকিম বিন জাবাল হঠাৎ করে তার দল নিয়ে হযরত আয়িশার রাযি. বাহিনীর উপর আক্রমণ করে বসে। কিন্তু হযরত আয়িশা রাযি. তাঁর বাহিনীকে যুদ্ধ এড়িয়ে শুধু প্রতিরোধের নির্দেশ দেন।


      কিন্তু ধীরে ধীরে এ যুদ্ধ ব্যাপক আকার ধারণ করে। সে মুহূর্তে উসমান বিন হানিফ হাকিম বিন জাবালার পক্ষ অবলম্বন করেন। অবশেষে উসমান বিন হানিফ পরাজিত হয় এবং বসরা শহর হযরত আয়িশার রাযি. নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বসরা দখলের পর হযরত উসমানের রাযি. বিরুদ্ধে যে সকল বসরাবাসী বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল হযরত ত্বালহা ও যুবাইরের রাযি. নির্দেশে তাদের অনেককেই গ্রেফতার করে হত্যা করা হয়। আর কিছু লোক পলায়ন করে আত্মরক্ষা করে।


      হযরত আয়িশার রাযি. বসরা অভিযান ও তথায় তাঁর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সংবাদ শুনে হযরত আলী রাযি. সিরিয়া অভিযান স্থগিত রেখে ইরাক তথা বসরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। ‘যী-ক্বার’ নামক স্থানে হযরত আলী রাযি. বসরার নিকট শিবির স্থাপন করেন।


      সন্ধি প্রচেষ্টাঃ হযরত আলী রাযি. আলোচনার মাধ্যমে মতবিরোধ নিষ্পত্তির আশায় ক্বা‘ ক্কা‘ বিন আমরকে বসরায় পাঠালেন। ক্কা‘ ক্কা‘ একজন বিচক্ষণ ও বাকপটু ব্যক্তি ছিলেন। তিনি হযরত আয়িশা, ত্বালহা ও যুবাইরের রাযি. দরবারে এসে আরয করলেন আপনারা যে এত কষ্ট করে এখানে এসেছেন, এতে আপনাদের উদ্দেশ্য ও নেক নিয়ত কি? হযরত আয়িশা রাযি. ও তাঁর সঙ্গীরা উত্তর দিলেন আমাদের উদ্দেশ্যে মুসলমানদের ঐক্যে যে ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসন করা ও কুরআনের আদেশ বাস্তবায়িত করা।


      ক্বা‘ ক্বা‘ বললেন- তাহলে এ লক্ষ্য অর্জনে আপনারা কি পন্থা নির্ধারণ করেছেন ? তারা উত্তর দিলেন- ‘হযরত উসমানের রাযি. হত্যাকারীদেরকে হত্যা করতে হবে। কেননা তাঁর হত্যার কিসাস (হত্যার বদলে হত্যাকারীকে হত্যা করা) না নেয়া হলে কুরআনের বিরুদ্ধাচরণ করা হবে।


      ক্বা‘ ক্বা‘ বললেন- হযরত উসমানের রাযি. হত্যার কিসাসের দাবী তো যুক্তিযুক্ত এবং তাতে আমাদের কারো দ্বিমত নেই। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত খিলাফতের ভিত্তি সুদৃঢ় না হবে এবং রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে না ‘আসবে ততক্ষণ তো এ দায়িত্ব পালন করা সম্ভবপর নয়। দেখুন আপনারা বসরার বিদ্রোহীদের নিকট হতে কিসাস নিয়েছেন কিন্তু হারকুম বিন যাহীরকে শায়েস্তা করতে পারেননি বরং তাকে হত্যার করতে চাইলে তার পক্ষে ছয় হাজার মানুষ দাড়িয়ে গেল অবশেষে আপনারা তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তাহলে আপনারা যখন পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে হযরত উসমানের রাযি. হত্যাকরীদের মধ্য হতে একজনকে আপাততঃ ছেড়ে দিতে পারলেন তাহলে হযরত আলী রাযি. যদি সকলের বিচার সাময়িকভাবে স্থগিত রাখেন তাহলে তার অন্যায় কোথায়? অতএব, এই অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার সমাধান এভাবেই হতে পারে যে, আপনারা সকলে আমীরুল মুমিনীন হযরত আলীর রাযি. পতাকাতলে সমবেত হয়ে বিদ্রোহীদের বিচারের জন্য তাঁর হাতকে শক্তিশালী করবেন এবং নিজেদেরকে ও আমাদেরকে এমন বিপদে নিক্ষেপ করা হতে বিরত থাকবেন যার পরিণতিতে আমরা উভয়ই ধ্বংস হয়ে যাব। কোন একক ব্যক্তি বা দলের নয় বরং তা সমগ্র জাতির ঐক্য ভাঙনের কারণ হবে। আমি আশা করি আপনারা যুদ্ধ বিগ্রহের চেয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানকেই অগ্রাধিকার দিবেন।


      ক্বা‘ক্বা‘র এ যুক্তিপূর্ণ উপস্থাপনায় হযরত আয়িশা রাযি. ও তাঁর দুই অনুসারী হযরত ত্বালহা ও যুবাইর রাযি. অত্যন্ত প্রভাবান্বিত হলেন এবং তাঁরা বললেন যে, আপনার এ ফর্মুলা তো অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ। কিন্তু হযরত আলীর রাযি. ও কি এই মত? যদি তাঁরও এই মত হয়ে থাকে, আর তিনি হযরত উসমানের রাযি. হত্যাকরীদের বিচারে প্রস্তুত থাকেন, তাহলে অতি সহজেই এ সংকট নিরসন হতে পারে।


      ক্বা’ক্বা’ ফিরে এসে হযরত আলীকে রাযি. উপরোক্ত আলোচনার বিবরণ শুনালে হযরত আলী রাযি. অত্যন্ত খুশী ও আশান্বিত হয়ে উঠলেন । ক্বা‘ক্বা‘র সঙ্গে হযরত ত্বালহা ও হযরত যুবাইরের রাযি. কিছু অনুসারীও হযরত আলীর রাযি. নিকট তার প্রকৃত মনোভাব জানার জন্য ‘আসল। কেননা তাদের নিকট সাবায়ীরা এই অপপ্রচার চালাচ্ছিল যে, হযরত আলী রাযি. বসরা বিজয় করে তথাকার যুবকদের হত্যা করবেন আর শিশু ও নারীদের গোলাম-বাঁদী বানিয়ে নিবেন।


      হযরত আলী রাযি. তাদেরকে একান্তে নিয়ে এ সকল মিথ্যা অপপ্রচারে কান না দেয়ার পরামর্শ দেন এবং তার পক্ষ হতে এরূপ আচরণ না হওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করেন। তারা হযরত আলীর রাযি. বাহিনীকে শান্তির প্রত্যাশী ও যুদ্ধ পরিহারে আগ্রহীই দেখতে পেল। দীন ও ইসলামী উম্মাহর স্বার্থে উভয় পক্ষের এই ইখলাস ও নমনীয়তায় যে আন্তরিক পরিবেশ সৃষ্টি হয় তাতে মুসলমানদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও গৃহযুদ্ধের আশংকা দূরীভূত হয়ে ‘আসছিল আর এরূপ আশার আলো দেখা যাচ্ছিল যে, মুসলমানদের উভয় পক্ষ পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সাবায়ীদের সৃষ্ট দ্বন্দ্ব কলহকে ভুলে গিয়ে অচিরেই চূড়ান্ত ঐক্যের ঘোষণা দিবেন এবং উভয় পক্ষ হযরত আলীর রাযি. খিলাফতের পতাকাতলে একতাবদ্ধ হয়ে খিলাফতের ভিত্তিকে দৃঢ় করে খিলাফত ব্যবস্থা ধ্বংসের ষড়যন্ত্রকারী ও হযরত উসমানের রাযি. হত্যাকারী সাবায়ী চক্রকে সমূলে উৎখাত করে তাদের সকল ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত গুঁড়িয়ে দিবেন এবং তাদেরকে চরম শাস্তি প্রদান করবেন।


      অতএব, উভয় পক্ষের এই ঐক্য ইসলাম ও ইসলামের উন্নতির মূল ভিত্তি ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা ও মুসলমানদের জন্য মঙ্গলজনক হলেও আব্দুল্লাহ বিন সাবা ও তার দলের জন্য তা ছিল মৃত্যু ঘণ্টা । তাই তারা এতে নিজেদের প্রমাদ গুনলো এবং যে কোন মূল্যে মুসলমানদের এ ঐক্য প্রয়াস ব্যর্থ করার হীন ষড়যন্ত্রে মত্ত্ব হল। যার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নে উদ্বৃত্ত হচ্ছে।


   _*📋নিজে পড়বেন এবং শেয়ার করে অন্যদেরকেও জানার সুযোগ করে দিবেন।*_

13. ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস

 *ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস* 


 *====== প্রথম অধ্যায়,পর্ব -১৩ ======*


*উচ্চপদে আত্মীয়দের নিয়োগদান প্রসঙ্গে* 


      সরকারী চাকুরীতে স্বীয় আত্মীয় ও বংশীয় লোকদের অধিক হারে উচ্চপদ তথা গভর্ণরী প্রদানের যে অভিযোগ হযরত উসমান রাযি. এর বিরুদ্ধে করা হয়েছিল তার অসারতা প্রমাণে তার খিলাফত কালের ৪৭ জন গভর্ণরের নামের তালিকার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে অতিসহজেই উত্তর পাওয়া যায় যে, উক্ত ৪৭ জন গভর্ণরের মধ্যে মাত্র ৫ জন হযরত উসমান রাযি. এর সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। তন্মধ্যে তিনজন ছিলেন তার নিজ বংশ তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গোত্র কুরাইশের শাখা উমাইয়া গোত্রের। কিন্তু এই তিন জনের মধ্যে দুই জনই ছিলেন হযরত উমর রাযি. কর্তৃক নিয়োজিত। উক্ত পাঁচ জনের মধ্যে অপর দুই জন হযরত উসমান রাযি. এর আত্মীয় ছিলেন কিন্তু আত্মীয়তা অভিযোগের কারণ হতে পারে না। বরং হযরত উসমান রাযি. কে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত করার জন্যই কেবল এ ধরনের কথা উত্থাপন করা হয়েছিল। নতুবা শুধু আত্মীয়তার খাতিরে হযরত উসমান রাযি. কাউকে গভর্নর নিয়োগ করেননি। যাকেই গভর্নর নিয়োগ করেছেন যোগ্যতাও পরামর্শের ভিত্তিতেই করেছেন। ৪৭ জন গভর্নরের ভিতরে ২/৪ জন যদি তার নিজ গোত্রের হয় এবং হযরত উসমানের রাযি. বিরাট গোত্রের মধ্যে যোগ্যতা সম্পন্ন লোক থাকাটাও স্বাভাবিক; তাহলে  তাদেরকে দায়িত্বে বসালে তাতে এমন কি অপরাধ হতে পার ? বরং যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য দায়িত্বে না বসানোই অপরাধ এবং জনসাধারণের উপর জুলুম করার শামিল। কারণ বেশী যোগ্য লোক থাকতে যদি তার চেয়ে কম যোগ্য লোক দায়িত্বে বসানো হয় তাহলে নিশ্চয় জনসাধারণ ধর্মীয় সুযোগ সুবিধা ও ন্যায় বিচার কম পাবে যা অত্যন্ত স্পষ্ট। সুতরাং হযরত উসমান রাযি. এর উপর স্বজন-প্রীতির অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এটা শুধু বক্র দিল ও ট্যারা চোখ সম্পন্ন লোকদের স্বার্থবাদী অপতৎপরতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র।


          *ষড়যন্ত্রের দ্বিতীয় পর্ব:* 


      সাবায়ীদের চাপের মুখে হযরত আলীর রাযি. খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ সাবায়ী ষড়যন্ত্রের এ পর্বকে মুসলমানদের পরস্পরে চিরস্থায়ী অনৈক্য সৃষ্টির অধ্যায় বলা চলেঃ


      আব্দুল্লাহ বিন সাবার মুনাফিক দল কর্তৃক খলীফা হযরত উসমানের রাযি. শাহাদাতের পর মুসলিম জাহানের প্রথম করণীয় ছিল সর্বসম্মতিক্রমে একজন খলীফা মনোনীত করে ইসলামী খিলাফতের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করা এবং মুসলমানদের ঐক্যকে সুসংহত রাখা ও শরয়ী বিধান মুতাবিক হযরত উসমানের রাযি. হত্যাকারী ও বিদ্রোহীদের বিচার করা। কিন্তু সেসব যদি বাস্তবায়িত হয়ে যায় তাহলে আব্দুল্লাহ বিন সাবা ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা ধ্বংসের যে নীল নকশা প্রণয়ন করেছিল শুধু যে তা বিধ্বংস হয়ে তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হবে তা ই নয়, বরং তখন তার ও তার দলের ভয়াবহ পরিণামের সম্মুখীন হতে হবে। তাই হযরত উসমান রাযি. কে হত্যা করার পর তার সর্বপ্রথম তৎপরতা ছিল ইসলামের উন্নতির চালিকা শক্তি উম্মতের সর্বসম্মত খিলাফত ব্যবস্থা যেন আর দ্বিতীয়বার প্রতিষ্ঠা না হতে পারে। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সাবায়ী দলের লোকেরা মুসলিম উম্মাহর সর্ব সম্মতিক্রমে একজনকে খলীফা বানিয়ে তার নেতৃত্বে সকলের একতাবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টাকে ঠেকিয়ে রাখার লক্ষ্যে তারা হজ্জের মওসুমে অধিকাংশ সাহাবী রাযি. ও শান্তিপ্রিয় জনগণশূণ্য দারুল খিলাফত মদীনায় যে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে হযরত উসমান রাযি. কে শহীদ করেছিল সেই পরিস্থিতিতে নিজেরাই গোটা পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে হযরত আলী রাযি. কে খলীফা পদপ্রার্থী হতে বাধ্য করে।


       হযরত আলী রাযি. বিশিষ্ট সাহাবী হযরত ত্বালহা রাযি. ও যুবাইর রাযি. এর নিকট খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের আবেদন জানিয়ে ব্যর্থ হয়ে সাহাবা শূন্য মদীনায় যে স্বল্প সংখ্যক বিশিষ্ট সাহাবা রাযি. বিদ্যমান ছিলেন তাদের পরামর্শে ও বিধ্বস্ত খিলাফত পুনরুদ্ধারের শেষ আশায় এই গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিতে বাধ্য হয়ে সম্মতি প্রদান করেন। এর পূর্বে সাবায়ীরা মদীনাবাসীকে খলীফা নির্বাচনের জন্য তিন দিনের সময় সীমা বেঁধে দিয়েছিল। এ সময়ের মধ্যে কাউকে খলীফা বানাতে ব্যর্থ হলে সকলকে হত্যার হুমকি পর্যন্ত তারা দিয়েছিল। ঘটনা পরস্পরার এক পর্যায়ে তারাই হযরত আলীর রাযি. নাম প্রস্তাব করে। অতঃপর উল্লেখিত পন্থায় কতিপয় বিশিষ্ট সাহাবীর রাযি. পরামর্শে হযরত আলী রাযি. খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।


      হযরত আলীর রাযি. খলীফা হওয়ার পিছনে মূলতঃ সাবায়ীদের ভূমিকা থাকলেও তাঁর পক্ষে মদীনার একাধিক বিশিষ্ট সাহাবার রাযি. সমর্থনও ছিল। তাছাড়া বাস্তবিক পক্ষেও তখন হযরত আলী রাযি. খলীফা হওয়ার জন্য সর্বদিক দিয়ে যোগ্য ছিলেন। যার প্রমাণ হযরত উসমান রাযি. কে খলীফা মনোনীত করার সময় সমগ্র মুসলিম বিশ্বের রায় দু’ব্যক্তির ব্যাপারে সীমাবদ্ধ ছিল। অধিকাংশ গোত্র ও লোকের হযরত উসমানের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। অবশিষ্টরা হযরত আলীর রাযি. পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেছিলেন। এ দু’জন ব্যতীত অন্য কারো ব্যাপারে প্রস্তাব আসেনি। যে কারণে হযরত আলী রাযি. বিরোধী অন্যান্য সাহাবীগণ রাযি. কাউকে হযরত আলীর রাযি. বিরুদ্ধে পাল্টা খলীফা মনোনীত করেন নি। বরং তারা শুধু সাবায়ীদের ব্যাপারে বিশেষ আপত্তির কারণে হযরত আলীর রাযি. হাতে বাইয়াত হতে অস্বীকার করেছিলেন, এসকল কারণে অর্থাৎ মদীনায় অবস্থিত বিশিষ্ট সাহাবায়ে কিরামের সমর্থন, ও স্বীয় যোগ্যতা বলে হযরত আলীর খলীফা মনোনীত হওয়া শুদ্ধ ছিল এবং তিনি ‘খলীফায়ে বরহক’ ছিলেন। এ ব্যাপারে উম্মতের মধ্যে কোন দ্বিমত নেই।


      হযরত আলীর রাযি. উল্লেখিত পন্থায় খলীফা মনোনীত হওয়ার পর মদীনায় অবস্থিত যে সকল সাহাবী রাযি. তাঁর হাতে উল্লেখিত আপত্তির কারণে বাই’আত হতে অস্বীকার করেন, তাদের মধ্যে কতেককে বিশেষতঃ হযরত ত্বালহা ও যুবাইরের রাযি. ন্যায় বিশিষ্ট দুই সাহাবীকেও রাযি. সাবায়ীরা ঘাড়ের উপর তরবারী ধরে হযরত আলীর রাযি. হাতে বাই’আত হতে বাধ্য করে। খিলাফতের শূন্য পদে তাৎক্ষণিকভাবে একজনকে খলীফা বানানোতে তাদের উদ্দেশ্যে ছিল নিজেদের ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা ধ্বংসের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র হতে মুসলমানদের দৃষ্টি আড়াল করে রাখা, জনগণের রোষানল থেকে আত্মরক্ষা করা এবং খিলাফত ব্যবস্থায় জবরদস্তি নিজেদের সম্পৃক্ত করে নিজেরা ক্ষমতার অংশীদার হয়ে ধীরে ধীরে মনোনয়নে বিভেদ সৃষ্টি‌ করে ধাপে ধাপে খিলাফত ব্যবস্থাকে চিরতরে বিনষ্ট করে দেয়া। হযরত আলীর রাযি. মত গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বকে খলীফা মনোনীত না করলে তাদের এ সকল উদ্দেশ্যে অর্জিত হতো না বরং তখন মুসলমানরা সম্মিলিতভাবে কাউকে খলীফা বানিয়ে তাঁর নেতৃত্বে খলীফা হযরত উসমানের রাযি. হত্যাকারী সাবায়ীদের সমূলে ধ্বংস করে দিতে পারতো। এ জন্য হযরত উসমান রাযি. কে শহীদ করার পর সাবায়ীদের সকল ষড়যন্ত্র মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে তা বাড়ানো ও জিইয়ে রাখার লক্ষ্যে প্রণীত হয়। সে লক্ষ্যে তারা হযরত আলী রাযি. কে খলীফা মনোনয়ন ও বিরোধীদেরকে জোর পূর্বক তাঁর হাতে বাই’আত করার উল্লেখিত পন্থা অনুসরণ করে।


      মদীনার বিশিষ্ট সাহাবীগণের রাযি. সমর্থন ও স্বীয় যোগ্যতার কারণে হযরত আলী রাযি. খলীফায়ে বরহক হলেও তার মনোনয়নে হযরত উসমানের রাযি. হত্যাকারী সাবায়ী চক্রের হাত থাকা ও বিরোধীদেরকে সাবায়ী দল কর্তৃক জোর পূর্বক বাই’আত হতে বাধ্য করা এবং খিলাফতের গুরুত্বপূর্ণ পদে সাবায়ীদের জবরদস্তিমূলক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার দরুন বিপরীত মত সৃষ্টির সুযোগ করে দেয়। যে কারণে আশারায়ে মুবাশশারাহ তথা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখে একই মজলিসে এই দুনিয়ায় জীবিত থেকে বেহেশতের শুভ সংবাদ লাভকারী দশজন সাহাবীর রাযি. অন্যতম দু’জন হযরত ত্বালহা ও হযরত যুবাইর রাযি. জোরপূর্বক হযরত আলীর রাযি. হাতে বাই’আত করেও তা প্রত্যাহার করে নেন এবং হযরত আয়িশা রাযি. ও হযরত মুআবিয়া রাযি.এবং উম্মুল মুমিনীনসহ বিশিষ্ট অনেক সাহাবীই রাযি. হযরত আলী রাযি. হাতে বাই’আত না হয়ে হযরত উসমানের রাযি. হত্যাকারী সাবায়ীদের হযরত আলী রাযি. কর্তৃক বিচারের দাবীতে বিরোধী শিবিরে অবস্থান গ্রহণ করেন।


 *বিঃদ্রঃ* 


       *ভ্রান্তি নিরসনঃ* আর্টিকেল এর মধ্যে সাহাবী ও সাবায়ী শব্দ দুটি বহু জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে। তাই সাধারণ পাঠকদের মাঝে যাতে এ সম্পর্কে কোন বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয় সেজন্য শব্দ দু’টির সংজ্ঞা নিম্নে প্রদত্ত হলঃ


    *সাহাবী:* যে সকল মহান ব্যক্তি ঈমান থাকা অবস্থায় রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন লাভে ধন্য হয়েছেন এবং ঈমান থাকা অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। 


    *সাবায়ী:* কুখ্যাত ইয়াহুদী আব্দুল্লাহ বিন সাবা’র অনুসারীদেরকে বলা হয় সাবায়ী।


   _*📋নিজে পড়বেন এবং শেয়ার করে অন্যদেরকেও জানার সুযোগ করে দিবেন।*_

12. *ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস*

 *ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস* 


 *====== প্রথম অধ্যায়,পর্ব -১২ ======*


 *হযরত উসমান রাযি. এর বিরুদ্ধে কয়েকটি ভিত্তিহীন অভিযোগঃ* 


      হযরত উসমান রাযি. এর বিরুদ্ধে ইবনে সাবা কর্তৃক আরোপিত স্বজন-প্রীতি তথা স্বীয় বংশীয় লোকদেরকে রাষ্ট্রীয় তহবিল হতে অধিক সম্পদ প্রদান ও সরকারী চাকুরীতে অধিক হারে তাদের নিয়োগ দানের অপবাদ দেয়া হয়েছিল। যার উপর ভিত্তি করে আজ ইসলামী খিলাফতের বিকৃত ইতিহাস রচিত হয়েছে। এগুলো যে কেবলমাত্র ইবনে সাবার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তার সাজানো, মনগড়া ও মিথ্যা অভিযোগ ছিল, সে বিষয়টি পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু যেহেতু সেই সাবায়ী দলের গর্হিত ইতিহাসের ভিত্তিতেই বর্তমানে জনসাধারণের মাঝে প্রচলিত ইসলামী খিলাফতের বিকৃত ইতিহাস রচিত তাই নতুন করে তার অসারতা প্রমাণ করা প্রয়োজন।


      স্বীয় বংশীয় লোকদের অধিক সম্পদ দান সংক্রান্ত অভিযোগের উত্তর স্বয়ং হযরত উসমান রাযি.-এর মুখেই শুনুন এবং বাস্তবতার প্রতিও লক্ষ্য রাখুন।


      একবার ইবনে সাবা কুফা হতে তার কিছু অনুচরকে নেককার মানুষের বেশে মদীনা প্রেরণ করলো যেন তারা জনসমক্ষে হযরত উসমান রাযি. কে এতদসংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ও তাকে হেস্তনেস্ত করে এবং চূড়ান্তরূপে অভিযুক্ত করতে সক্ষম হয়।


      হযরত উসমান রাযি. গোপনে তাদের উদ্দেশ্য ও মদীনা আগমনের সংবাদ পেয়ে তাদেরকে মসজিদে ডাকালেন। ইতিমধ্যেই আজান দেয়া হল। তারা খলীফা হযরত উসমানের একেবারে সম্মুখে মিম্বরের নিকটবর্তী স্থানে বসলে উপস্থিত সাহাবীগণ রাযি. খলীফাকে ঘিরে বসলেন। খলীফা উসমান রাযি. উপস্থিত জনতাকে ইবনে সাবার অনুচরদের উদ্দেশ্যে ও পরিকল্পনা অবগত করিয়ে বিস্তারিত ভাষণ দেন। জনগণ তখন সেই কুচক্রীদের মৃত্যুদণ্ড দাবী করে। হযরত উসমান রাযি. উত্তরে বলেন আমি তাদের ক্ষমা করে দিব এবং আমার সৎ প্রচেষ্টায় তাদের বুঝাতে চেষ্টা করবো। আমি কাউকে প্রাণদণ্ড দিব না যাবৎ না সে প্রাণদণ্ডের অপরাধ করে অথবা প্রকাশ্যে কুকুরী করে। অতঃপর তিনি স্বজন-প্রীতির কথিত অভিযোগের উত্তরে বলেনঃ তারা অভিযোগ করে থাকে আমি আমার আপন জনদের অধিক ভালবাসি এবং তাদের অধিক দিয়ে থাকি। এ সম্পর্কে আমার বক্তব্য এই যে আপনজনের সঙ্গে স্বাভাবিক ভালবাসা আছে বটে কিন্তু কোন অন্যায় ব্যাপারে তাদের পক্ষ সমর্থন করি না। বরং তাদের প্রাপ্য হক আমি তাদের নিকট পৌঁছে দেই মাত্র।


      আর তাদের যে অধিক দিয়ে থাকি, তা আমার ব্যক্তিগত ও নিজস্ব সম্পদ হতে দিয়ে থাকি। মুসলমানদের সম্পদ তথা সরকারী ধন ভাণ্ডারকে আমি আমার জন্য এবং আমার আত্মীয় বা নিজস্ব কোন ব্যক্তির জন্য হালাল মনে করি না।


      রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমলে এবং আবু বকর ও উমর রাযি. এর আমলেও আমি আমার ব্যক্তিগত সম্পদ হতে ভাল ভাল ও বড় বড় দান করতাম। অথচ ঐ সময় তো বয়স হিসেবে পার্থিব ধন-সম্পদের প্রতি অধিক লোভ লালসার সময় ছিল। আর যখন আপন পরিজনের মধ্যে আমার বয়স সর্বাধিক। আমার বয়স শেষ সীমায় পৌঁছিয়েছে (৮০ হতে ৯০) এমতাবস্থায় আমি আমার ব্যক্তিগত বা নিজস্ব যা কিছু ছিল আপনজনদের দিয়ে দিয়েছি তাতে বেঈমানরা নানা রকম কথা বলে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন আমি যখন খলীফা নির্বাচিত হয়েছিলাম তখন আমি আরবের সর্বাধিক ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলাম। আরবের সবচেয়ে বেশী উট-বকরী আমার ছিল। বর্তমান মুহূর্তে আমার হজ্জের জন্য রক্ষিত দুটি উট ছাড়া অতিরিক্ত একটি উট বা একটি বকরীও আমার নেই। আমার সব আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছি। হযরত উসমান রাযি. স্বীয় এই উক্তির উপর মদীনাবাসী জনগণের সাক্ষ্য চাইলেন- এটাই কি প্রকৃত অবস্থা নয়? তারা সকলে একবাক্যে আল্লাহকে হাজির নাযির উল্লেখ করতঃ বললেন, হ্যাঁ এটা বাস্তব সত্য।


      হযরত উসমান রাযি. এর এই বক্তৃতার বর্ণনাকারী এ তথ্যও প্রকাশ করেছেন যে, হযরত উসমান রাযি. তার সমুদয় সম্পত্তি স্বীয় বংশের লোকদের মাঝে বণ্টন করে দিয়েছিলেন। আর এক্ষেত্রে তিনি আপন পুত্র-কন্যাকে দানকৃত লোকদের সমশ্রেণীর করে দিয়েছিলেন। বস্তুতঃ ইসলামের বিধান অনুযায়ী নিজস্ব মাল দেয়ার সময় স্বীয় বংশ ও আত্মীয় স্বজনই অগ্রগণ্য-এটাই সুন্নত তরীকা।


      তাছাড়া হযরত উসমান রাযি. ব্যক্তিগতভাবে ইসলামের পূর্ব হতেই আরবের অন্যতম ধনী ব্যক্তি হওয়ার পাশাপাশি তিনি অত্যন্ত দানশীল ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে তার সিংহভাগ সম্পদই মুসলমানদের কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হয়। যে কোন ধরনের নেক কাজে সম্পদ ব্যয় করায় তিনি থাকতেন সর্বাগ্রে। এ জন্য তাকে বলা হতো উসমানে গনী বা ধনী উসমান।


   _*📋নিজে পড়বেন এবং শেয়ার করে অন্যদেরকেও জানার সুযোগ করে দিবেন।*_

44. ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস*

 *⛲ ♧  ﷽   ﷽   ﷽   ﷽*  *♧*  *⛲*       *ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস*  *🥀====তৃতীয় অধ্যায়,পর্ব -১৫====🥀*      *আহলে বাইতের সদস্য ব...